যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন পুলিশের অভিযান জোরদার হওয়ার পর একে অপরকে রক্ষায় এগিয়ে আসছেন সাধারণ প্রতিবেশীরা।
গত বছরের শেষ দিকে নিজের এক প্রতিবেশীকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করেছে, এমন খবর জানার পরই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন জেনিফার আর্নল্ড।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তিনি (ওই প্রতিবেশী) ফোন ধরেই কাঁদছিলেন। কাজের জায়গায় স্বামীর সঙ্গে গিয়েছিলেন, তখন পুলিশ গাড়ি থেকে তাকে টেনে নামিয়ে ধরে নিয়ে যায়।’
এক মাস পর, আর্নল্ড এখন পুরো পাড়া জুড়ে এক ধরনের সহায়তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অভিযানের মধ্যে অভিবাসী পরিবারগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করা।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
এই অভিযান চলতি সপ্তাহে প্রাণঘাতী রূপ নেয়। ওই ঘটনায় এক ফেডারেল এজেন্ট একটি এসইউভি চালানো নারীর ওপর গুলি চালায়।
আর্নল্ড জানান, শুরুতে তিনি এমন প্রতিবেশীদের সাহায্য করতেন, যারা বাড়ি থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা বলছিল, বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়।’
এরপর তিনি লক্ষ্য করেন, কাছের স্কুল বাসস্টপে যেখানে সাধারণত ২০ জন শিশু থাকত, সেখানে হঠাৎ করে মাত্র ১০ জন শিশু আসছে।
আর্নল্ড বলেন, ‘অনেক পরিবারই তাদের সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছিল, কারণ, বাসস্টপে যেতে দুই ব্লক হাঁটতে হয়।’
তিনি প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনাদের সন্তানের সঙ্গে কেউ হাঁটলে বা গাড়িতে করে স্কুলে পৌঁছে দিলে, তাহলে কি তাকে পাঠাবেন?’
তার এই প্রস্তাবে প্রতিবেশীরা সম্মতি জানান।
ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আর্নল্ড এক ডজন শিশুকে স্কুলে পৌঁছাতে সহায়তা শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘পরের সপ্তাহে সেটা ১৮ জন হলো। এখন আমার এই তালিকায় ৩০ জন শিশু আছে।’
একটি পরিবার ‘দত্তক’ নেওয়ার উদ্যোগ
অভিভাবক, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের বন্ধুর মধ্য থেকে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম লেখান।
এদের কেউ শিশুদের বাসস্টপে পৌঁছে দেন, কেউ গাড়িতে করে স্কুলে আনা-নেওয়া করেন, যাতে পড়াশোনায় তারা পিছিয়ে না পড়ে।
ক্রিসমাসে স্কুল বন্ধ থাকায় আর্নল্ড স্বেচ্ছাসেবকদের একটি করে পরিবার ‘দত্তক’ নিতে অনুরোধ করেন এবং তাদের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা বাজার করে খাবার পৌঁছে দিত। একবার ক্রিসমাসের আগে, আরেকবার নববর্ষের আগে। অনেকেই বলেছেন, এই সাহায্য না পেলে তাদের সন্তানরা না খেয়ে থাকত।’
বুধবার মুখোশধারী আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এজেন্টদের গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী রেনি নিকোল গুড নিহত হওয়ার পর, স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এখনো মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় আইসিই অভিযান চলছে।
আর্নল্ড বলেন, ‘আমি একটি চার বছরের শিশুকে আনতে গিয়েছিলাম এবং তাকে এমন এক প্রতিবেশীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলাম, যিনি প্রতিদিন তাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন। তখন রাস্তায় আরও মানুষ এসে বলল, আমরাও কি এটা করতে পারি?’
তিনি বলেন, ‘বুধবারের ঘটনার পর এই তালিকা আরও বড় হচ্ছে।’
এদিকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে মিনিয়াপোলিস কর্তৃপক্ষ শুক্রবার ঘোষণা দেয়, যে সব শিক্ষার্থী প্রয়োজন মনে করবে, তাদের জন্য ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হবে।
রাস্তায় যখনই আইসিই এজেন্টদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তখনই প্রতিবেশীরা বাঁশি ব্যবহার করে একে অপরকে এই এজেন্টদের সম্পর্কে সতর্ক করছেন।
শিক্ষক ইউনিয়ন নেত্রী নাতাশা ডকটার বলেন, ‘আমি এখন সব সময় বাঁশি সঙ্গে রাখি। সত্যি বলতে, যতটা চাই, তার চেয়েও বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে।’
তিনি জানান, এই বাঁশি প্রতিবেশীদের মধ্যে আলোচনার সুযোগও তৈরি করছে। আগ্রহীদের দেওয়ার জন্য তিনি পকেটে অতিরিক্ত বাঁশি রাখেন।
যদিও অনেকেই একে অপরকে সতর্ক করছেন, তবু অনেক পরিবার নীরবে আতঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে।
৩৬ বছর বয়সী বেকা ড্রাইডেন এএফপিকে বলেন, ‘এমন শিশুরা আছে, যারা পরিবারের কাউকে হারিয়েছে। তারা ভীষণভাবে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত। এই সব শিশুরা প্রতিদিন আতঙ্কে থাকে, স্কুল ছাড়া তারা আর কোথাও যেতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, সন্তানদের বাস্তবতা বোঝানো অভিভাবকদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেকা ড্রাইডেন বলেন, ‘আমাদের বারবার এ সব ট্র্যাজেডি তাদের বোঝাতে হচ্ছে। তারা নিজেরা লক্ষ্যবস্তু হোক বা তাদের পাড়া-সমাজকে আক্রান্ত হতে দেখুক, এই মানসিক আঘাত আমাদের সব শিশুদের ওপরই পড়ছে।’