দীর্ঘদিনের পারমাণবিক বিরোধ নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় নমনীয়তা দেখানোর ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় দুই পক্ষের তৃতীয় দফার বৈঠক হয়। সকালে শুরু হওয়া বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই মূলত আলোচনা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর নির্দেশে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ, ডেস্ট্রয়ার ও ক্রুজার মোতায়েনের মধ্যেই এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মঙ্গলবারের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধান চান, তবে তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ইরানকে ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেন, অন্যথায় ‘খুব খারাপ কিছু’ ঘটবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সেন্ট কিটসে সাংবাদিকদের বলেন, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানানো একটি ‘বড় সমস্যা’। তাঁর ভাষ্য, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ‘শুধু আমেরিকায় আঘাত হানার জন্যই নকশা করা’ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি না হলে ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতেও অগ্রগতি কঠিন হবে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভিকে জানান, আলোচনার পরিধি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার পর্যন্ত সীমিত থাকবে। তাঁর দাবি, তেহরান ‘গম্ভীরতা ও নমনীয়তা’ নিয়েই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।
কয়েক দশকের অচলাবস্থা কাটাতে চলতি মাসেই দুই দেশ আবার আলোচনায় বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, অন্যান্য পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের অভিযোগ—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লক্ষ্য পরমাণু অস্ত্র তৈরি। তবে তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির মধ্যস্থতায় এ বৈঠক হচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যায় আরাঘচি ও আলবুসাইদি সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে ইরানের প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এবারই মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। আবার হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। বৃহস্পতিবার গ্রিসের ক্রিট দ্বীপসংলগ্ন বন্দর ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড হাইফার উপকূলের দিকে রওনা হয়েছে; শুক্রবার সেখানে পৌঁছানোর কথা। এছাড়া সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় এক ডজন এফ–২২ যুদ্ধবিমান ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন; পেন্টাগনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আলোচনা সামরিক সংঘাত ঠেকাতে পারবে কি না—সে মূল্যায়নে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত বাড়ায় মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে। দুটি সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে তা মোকাবিলায় সৌদি আরব তেল উৎপাদন ও রফতানি বাড়াচ্ছে।
মঙ্গলবার আরাঘচি বলেন, ইরান একটি ‘ন্যায্য ও দ্রুত’ চুক্তি চায়, তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার ছাড়বে না। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, ইরানের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ তৈরি করতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতির বিনিময়ে তেহরান নতুন কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পরিসর ও ধাপ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে বলে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁর ৩৬ বছরের শাসনামলের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে রয়েছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কঠোর নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি চাপে পড়েছে; জানুয়ারির বড় ধরনের বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, খামেনি গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিষিদ্ধ করেছেন—যার অর্থ তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ২০০০–এর দশকের শুরুতে জারি করা সেই ফতোয়ার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
আরাঘচি এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘চুক্তি নাগালের মধ্যেই আছে—যদি কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।’