শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবারও (৩ নভেম্বর) দেশের দুই শেয়ারবাজারে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বড় পতন হয়েছে মূল্যসূচকেও।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এমনিতেই মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। এর মধ্যে গার্মেন্টসশ্রমিকদের আন্দোলন, শিল্পাঞ্চলে ভাঙচুর ও অস্থিরতার ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নগদ অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক সদস্য বলেন, বাজার আগে থেকেই মন্দার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। এই চাপ সামাল দিতে পারছে না বাজার।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে। বর্তমান সরকারের আট মাসের মধ্যে এত বড় শ্রমিক আন্দোলন হবে, তা প্রত্যাশিত ছিল না। তবে শ্রমিকদের দাবিও অযৌক্তিক নয়। রাজধানীতে এ ধরনের আন্দোলন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার প্রভাব বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বেও পড়তে পারে।
তবে পুঁজিবাজারে চাপ তৈরির ক্ষেত্রে শ্রমিক আন্দোলনের চেয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। সাইফুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো অবস্থা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ব্যাংকে গিয়েও অনেকে প্রয়োজনমতো টাকা পাচ্ছেন না। এ কারণে নগদ অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন।
লেনদেনের শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী, পরে পতন
ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, মঙ্গলবার লেনদেনের শুরুতে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়ে। এতে সূচকও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে লেনদেন শুরুর আধা ঘণ্টা পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। একের পর এক প্রতিষ্ঠান দরবৃদ্ধির তালিকা থেকে দরপতনের তালিকায় চলে আসে। দিন শেষে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দর কমার পাশাপাশি বড় পতন হয় সূচকে।
দিন শেষে ডিএসইতে ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। কমেছে ২৬৭টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৫১টির দর।
ভালো মানের বা ১০ শতাংশ কিংবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৬টির শেয়ারদর বেড়েছে। কমেছে ১৫৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৩টির। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১১টির দর বেড়েছে, কমেছে ৫৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪টির।
অন্যদিকে ‘জেড’ গ্রুপের ৩১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে। কমেছে ৫৮টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩৪টির। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে একটির দর বাড়লেও কমেছে ২২টির। অপরিবর্তিত ছিল ৯টির দর।
ডিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ১৪৭ কোটি টাকা
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দরপতনের প্রভাবে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৪৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৮৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাছাই করা ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ২০ পয়েন্ট। দিন শেষে এ সূচক দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট কমে হয়েছে ১ হাজার ৩০ পয়েন্ট।
সূচকের পতন হলেও বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। মঙ্গলবার ডিএসইতে মোট ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪১৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল এনভয় টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ৩২ কোটি ১১ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মতিন স্পিনিংয়ের লেনদেন হয়েছে ২৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার। আর ১৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল।
লেনদেনের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের অন্যগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, শাহজিবাজার পাওয়ার, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, মালেক স্পিনিং ও সায়হাম টেক্সটাইল।
সিএসইতেও সূচকের পতন
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ১৭৪ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ৪৫টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১১২টির দর।
মঙ্গলবার সিএসইতে মোট ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকার। সে হিসাবে এক দিনের ব্যবধানে বাজারটিতে লেনদেন কমেছে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।